সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর
সাহিত্যে খেলা
প্রমথ চৌধুরী
অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটি বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্পচর্চার পন্থা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে বলা হয়েছে।
মূলত শিল্পীর খেলার মাধ্যমেই শিল্পরাজ্যের সব অক্ষয় সৃষ্টির জন্ম। শিল্প -সৃষ্টিতে শিল্পীর মনের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দেরই প্রকাশ ঘটে। শিল্প সৃষ্টির -' উপাদান নিয়ে শিল্পী খেলায় মেতে থাকেন। আর এই খেলার ফলেই তাঁর সৃষ্টি-কর্ম নানা অবয়ব পায়। 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী - ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্পসৃষ্টির উদাহরণ টেনেছেন। কাদামাটি নিয়ে মনের আনন্দে খেলাচ্ছলে তিনি বহু বহু বিখ্যাত সৃষ্টির জন্ম দিয়েছেন।
প্রশ্ন-২. 'এই পুতুল গড়া হচ্ছে তাঁর খেলা'- বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শিল্পীর খেলার মাধ্যমেই শিল্পরাজ্যের সব অক্ষয় সৃষ্টির জন্ম-লেখকের এই মনোভাবই ব্যক্ত হয়েছে আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে।
লেখকের মতে, শিল্পসৃষ্টিতে শিল্পীর মনের আনন্দেরই প্রকাশ ঘটে শিল্পসৃষ্টির উপাদান নিয়ে শিল্পী খেলায় মেতে থাকেন। আর এই খেলার ফলেই তার সৃষ্টিকর্ম নানান অবয়ব পায়। 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের রচয়িতা প্রমথ চৌধুরী তাঁর রচনায় ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর শিল্পসৃষ্টির উদাহরণ টেনেছেন। কাদামাটি নিয়ে পুতুল গড়া খেলার মাধ্যমেই তাঁর সব বিখ্যাত সৃষ্টির জন্ম হয়েছে। আর এই খেলাই হলো পৃথিবীর সব সৃজনশীল কর্মের মূল।
প্রশ্ন-৩. 'পৃথিবীর শিল্পী মাত্রেই এই শিল্পের খেলা খেলে থাকেন।'-ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পৃথিবীর সকল শিল্পীরই শিল্পসৃষ্টির প্রয়াসকে 'সাহিত্যে খেলা" প্রবন্ধের লেখক খেলা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
লেখক মত প্রকাশ করেছেন যে, শিল্পী যা কিছু সৃষ্টি করেন সেটি শিল্পীর কাছে একরকম খেলারই নামান্তর। বিখ্যাত ফরাসি ভাস্কর রোদ্যাঁর সৃষ্টিকর্মকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। মাটি নিয়ে পুতুল গড়ার খেলা খেলেই পৃথিবীজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন রোদ্যাঁ। ঠিক তেমনই পৃথিবীর সকল শিল্পীই খেলার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অভিনব সব সৃষ্টিশীল শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে যাচ্ছেন।
উত্তর: শিল্পরাজ্যে শিল্পীর রয়েছে অবাধ অধিকার, তাই নিজের সৃষ্টিকর্মকে তিনি খেলাচ্ছলে যেকোনো রূপ প্রদান করতে পারেন।
পৃথিবীর সকল শিল্পীই একরকম খেলার মাধ্যমে নিজ নিজ শিল্পের সাধনা করেন। এই খেলা করার অধিকার থাকার কারণেই তাঁদের সৃজনীলতার বহুমাত্রিক বিকাশ সম্ভব হয়ে ওঠে। তাই শিল্পী তাঁর সৃষ্টকর্মে আনতে পারেন নানা মাত্রিকতা। তাঁর শিল্পকর্ম যেমন শিবের আকৃতি পেতে পারে তেমনই সেটি আবার বাঁদরের অবয়বও পেতে পারে। তবে যাই তিনি সৃষ্টি করেন না কেন তাই হয়ে ওঠে শিল্পময়।
প্রশ্ন-৫. 'মন উঁচুতেও উঠতে চায়, নীচুতেও নামতে চায়।'- কেন?
উত্তর: বস্তুত মানুষের মন বড়ো বিচিত্র বলে সেটি তার নিজস্ব খেয়ালে নিয়ত অবস্থান পরিবর্তন করতে চায়।
অনেক চিন্তাবিদ মনকে একটি অন্ধকার ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অন্ধকার ঘর যেমন রহস্যজনক, তার কোথায় কী আছে তা 'বলা মুশকিল, তেমনই মানুষের মনও বড়োই রহস্যজনক। সাধারণ মানুষের মন অনেকটা গতিহীন। তারা প্রগতির পথে অগ্রসর হতে পারে না, আবার একেবারে পশ্চাৎ অবস্থানেও থাকতে চায় না। শিল্পীমনও সবসময় উঁচুদরের শিল্পকর্মে সন্তুষ্ট থাকে না; কখনো কখনো খেয়ালের বশে অতি সাধারণ শিল্পকর্মেও ব্রতী হয়। মহৎ শিল্পীরা এই উঁচু-নিচুতে গমনাগমন করতে পারেন সাবলীলভাবেই।
প্রশ্ন-৬. 'বেদীতে না বসলে আমাদের উপদেশ কেউ মানে না।'- বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসতে না পারলে কেউ উপদেশ মানে না- প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক একথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
লেখকের মতে, উচ্চস্থানে বসতে না পারলে কেউ মান্য করে না। মানুষ সবসময় শ্রেষ্ঠত্বকে গুরুত্ব দেয়। যে সমাজ বা দেশের উচ্চস্থানে আছে মানুষ তাকেই গুরুত্ব দেয়। অযোগ্য মানুষও যদি বক্তব্যের জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে যায়, মানুষ তাকেও গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। সমাজ শুধু উচ্চস্থানের মানুষকেই কদর করে। গুণী মানুষকে খুব কমই মূল্যায়ন করে। গুণী মানুষ যদি উন্নতির শিখরে পৌছাতে না পারে তাহলে সে মানুষের কাছে অজানাই থেকে যায়। এ কারণে প্রাবন্ধিক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।
প্রশ্ন-৭. 'রঙ্গমঞ্চে না চড়লে আমাদের অভিনয় কেউ দেখে না।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সাধারণ দৃষ্টিতে যেকোনো জিনিসের বাহ্যিক রূপটি প্রত্যক্ষ করা গেলেও তা হৃদয়গ্রাহী হওয়ার জন্য বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন দাবি করার বিষয়টি প্রশ্নোক্ত উক্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।
লেখকের মতে, সাধারণ মানুষের চোখ বস্তুর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে না। তাই যেকোনো বিষয় তাদের সামনে একটু বেশি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করতে হয়। নিজের কথা যেমন গুরুত্ব দিয়ে সাধারণের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকাশ না করলে কেউ মানে না তেমনই রঙ্গমঞ্চে না চড়লে অভিনেতার অভিনয় কেউ দেখে না। অভিনেতাকে আপন কলা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে হলে অবশ্যই রঙ্গমঞ্চে চড়তে হবে।
প্রশ্ন-৮. অনেকের পক্ষে উচ্চস্থানেওঠার চেষ্টা মহাপতনের কারণ হয় কেন?
উত্তর: সীমিত প্রতিভার কারণে নিজেদের আয়ত্তের বহির্ভূত স্থানে উঠবার চেষ্টা অনেকের মহাপতনের কারণ হয়।
মানুষের কাছে নিজের প্রভাব ও গুরুত্ব প্রমাণের চেষ্টা মানুষের স্বভাবগত। সাধারণ অন্যান্য সকলের চেয়ে উঁচু অবস্থানে না পৌঁছাতে পারলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা সম্ভব হয় না। তাই আমরাও নিরন্তর সেই চেষ্টাই করে যাই। এই উঁচুতে ওঠার চেষ্টা সবার জন্য সমান সাফল্য বয়ে আনে না। আয়ত্তের বাইরে কাজ করতে গেলে বরং হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রশ্ন-৯. 'এ পৃথিবীতে একমাত্র খেলার ময়দানে ব্রাহ্মণ-শূদ্রের প্রভেদ নেই।'- বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: খেলার ময়দানে উদ্দেশ্যহীন আনন্দদানই একমাত্র লক্ষ্য বলে সেখানে ধর্ম-বর্ণের কোনো প্রভেদ থাকে না।
খেলার ময়দানে আনন্দের জন্য ব্রাহ্মণের ছেলের সঙ্গে শূদ্রের ছেলে এমনকি রাজার ছেলের সঙ্গে দরিদ্রের ছেলেরও খেলায় যোগ দেওয়ার অধিকার আছে। সাহিত্যাঙ্গনও তেমনই একটি প্রভেদহীন খেলার ময়দান। আনন্দের জন্য সাহিত্যাঙ্গন সবার জন্য উন্মুক্ত- এ বিষয়টিই উদ্ধৃত উক্তিটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন-১০. শিল্পরাজ্যে বড়ো-ছোটো সকলের কী রয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শিল্পরাজ্যে বড়ো-ছোটো সকলের খেলা করবার অধিকার রয়েছে।
লেখকের মতে, সাহিত্য সৃষ্টি করার অধিকার সকলের আছে। বড়ো বড়ো সাহিত্যিক শুধু সাহিত্য রচনা করবেন তা নয়, সবাইকে কবিতা লেখার স্বাধীনতা দিতে হবে। সাহিত্য সৃষ্টির জন্য শুধু কবিরা সুযোগ পাবেন অন্যরা পাবেন না এটি হতে পারে না। সবারই শিল্পরাজ্যে বিচরণ ও খেলার অধিকার রয়েছে। ছোটো বা নবীন লেখকেরাও সেখানে অবাধে বিচরণ করতে পারবেন। সেখানে কোনো ভেদাভেদ করলে সাহিত্যের সত্যিকার অর্থে যে উদ্দেশ্য তা বিলীন হয়ে যাবে। সকল মানুষেরই গান গাওয়া, ছবি আঁকা, কবিতা লেখা ইত্যাদির অধিকার থাকা উচিত বলে লেখক মনে করেন। তাই লেখক বলেন, এই রাজ্যে সকলেরই স্বাধীনতা রয়েছে।
প্রশ্ন-১১. সাহিত্য জগতে আমাদের কী উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবেশ করা উচিত?
উত্তর: সাহিত্য জগতের পূর্ণ আস্বাদ পেতে হলে এ জগতে খেলা করার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রবেশ করা উচিত।
সাহিত্য জগতে ধনী-গরিব বা ছোটো-বড়ো কোনো প্রভেদ নেই। এখানে প্রবেশাধিকার আছে সবার। কিন্তু কোনো অভিপ্রায় বা কার্যসিদ্ধির প্রত্যাশা নিয়ে এ জগতে প্রবেশ করলে মানুষের মাঝে প্রভেদ স্পষ্টরূপে ধরা দিতে পারে। সাহিত্য জগতের আনন্দ সম্পূর্ণরূপে সবার সাথে মিলে উপভোগ করতে তাই খেলা করার মতোই প্রবেশ করতে হবে। খেলা করার মধ্যে কোনো প্রাপ্তির আশা থাকে না। সাহিত্যের রস আস্বাদনেও তেমনই প্রবৃত্তি থাকা বাঞ্ছনীয়।
প্রশ্ন-১২. লেখকদের কেন যথার্থ সামাজিক জীব বলা হয়েছে?
উত্তর: লেখকগণ সমাজকে উপলব্ধি করে লেখার মাধ্যমে তা প্রকাশ করেন বলে তাঁদের যথার্থ সামাজিক জীব বলা হয়েছে।
লেখকেরা নিজেদের অনুভব- উপলব্ধির কথাই তাঁদের রচিত সাহিত্যকর্মে তুলে ধরেন। আর এসব ভাবনার একটি অন্যতম উপাদান হলো লেখকের নিজস্ব সমাজ ও সমাজ-বাস্তবতা। নিরন্তন ভাবনাচিন্তার মাধ্যমে সমাজের কথা, বাস্তবতার চিত্র লেখকগণ শিল্পসম্মত করে সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলেন। ফলে পারিবারিক গণ্ডির নির্দিষ্টতা পেরিয়ে লেখকদের যথার্থ সামাজিক জীব বলা হয়েছে।
উত্তর: মানুষের মনের সাথে নিজের ভাবনার সংযোগ স্থাপন করে মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোই কবির কাজ।
সমাজের প্রচলিত গণ্ডিতে আবদ্ধ জীবন কবির জন্য নয়। সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় বিশ্বের পরিচয়ে। সাহিত্য জগতে খেলা করার মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমানবের মনে পৌঁছে যান কবি। কবির আপন মনের কথা তাই কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মানুষের জন্য নয়- সে কথার মাধ্যমে কবি যোগাযোগ করেন পৃথিবীর সকল মানুষের সাথে।
প্রশ্ন-১৪. মানুষের নয়ন মনআকর্ষণ করার সুযোগ কাদের কপালে কীভাবে ঘটে? বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: সাহিত্য জগতে যাদের খেলা করার ইচ্ছা, সাহস ও ক্ষমতা আছে তারাই মানুষের নয়ন মন আকর্ষণ করার সুযোগ পান।
প্রাবন্ধিকের মতে, সাধারণ মানুষের ধারণা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য প্রয়োজন উঁচুমঞ্চে আরোহণ করা বা উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করা। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনোযোগ পাওয়ার জন্য ইচ্ছার পাশাপাশি সাহস ও ক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। কেবল মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্য সাহিত্য রচনা করলে তার আবেদন স্থায়ী হয় না। মানুষের মনের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারলেই সার্থক সাহিত্যিক হওয়া সম্ভব হয়।
প্রশ্ন-১৫. মানুষ বক্তৃতা শোনার চেয়ে খেলা দেখতে বেশি আগ্রহী কেন?
উত্তর: বক্তৃতার মধ্যে কেবল নীতিকথাই থাকে, আর খেলার মধ্যে থাকে কেবল আনন্দ, তাই মানুষ খেলা দেখতে বেশি আগ্রহী।
গুণকীর্তন করাই সাধারণত বক্তৃতার মূল বিষয় থাকে। তাছাড়া বক্তৃতার মাধ্যমে নীতিকথা শোনানো হয়। ফলে এতে আনন্দলাভের কোনো উপকরণ থাকে না বলে মানুষ বক্তৃতা শুনতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে না। অপরপক্ষে, খেলার মূল উদ্দেশ্যই হলো আনন্দ দেওয়া। তাই মানুষ বক্তৃতা শোনার চেয়ে খেলা দেখতে বেশি আগ্রহী।
প্রশ্ন-১৬. মানুষের দেহমনের সকল ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে ক্রীড়া শ্রেষ্ঠ, কেননা তা উদ্দেশ্যহীন বা নিষ্কাম কর্ম।
প্রাবন্ধিকের মতে, সাধারণত মানুষ যখন খেলা করে তখন সে আনন্দ ছাড়া অন্য কোনোকিছুর আকাঙ্ক্ষা রাখে না। নিষ্কাম আনন্দই তার একমাত্র প্রত্যাশা। মানুষ খেলা করে শুধু সেসময়ের কাঙ্ক্ষিত আনন্দের জন্য, অন্য কোনোকিছু পাওয়ার ইচ্ছা তার থাকে না। 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক মনে করেন, এ কথাটির পিছনে ব্যক্তির কামনা-বাসনা বা অভিসন্ধির মতো কোনো হীন প্রবৃত্তি কাজ করে না। ক্রীড়াকে তাই তিনি শ্রেষ্ঠ কর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন।
উত্তর: আনন্দবিহীন উপরি পাওনার লোভে যে খেলা হয় তাকে জুয়াখেলার সাথে তুলনা করা যায়।
সাহিত্য হবে নিছক আনন্দের জন্য আর আনন্দময় সাহিত্যই হলো প্রকৃত সাহিত্য। প্রমথ চৌধুরী তাঁর এমন বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সাহিত্য কেবল সাহিত্যিকের হৃদয় নিঃসৃত আনন্দের ঝরনাধারা দিয়েই প্রবাহিত হবে। কেননা, উদ্দেশ্য-প্রধান সাহিত্য রচনা করলে বা অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য সাহিত্য রচনা করলে তা হবে অত্যন্ত নিম্নমানের সাহিত্য, যা অনেকটা জুয়াখেলার মতোই। কেননা, এতে উপরি পাওনার আশা থাকে। আর প্রকৃত সাহিত্যে থাকে উদ্দেশ্যবিহীন স্বতঃপ্রণোদিত খেলার মতোই নির্মল আনন্দ।
প্রশ্ন-১৮. লেখক আনন্দবিহীন খেলাকে জুয়া-খেলা বলেছেন কেন?
উত্তর: যে খেলায় আনন্দ নেই বরং উপরি পাওয়ার আশা আছে লেখক তাকে জুয়াখেলা বলার পক্ষপাতী।
প্রাবন্ধিকের মতে, মানুষের দেহমনের সকল প্রকার ক্রিয়ার মধ্যে খেলাই শ্রেষ্ঠ। কেননা, তা উদ্দেশ্যবিহীন। তবে যেকোনো খেলায় আনন্দ থাকা আবশ্যক। আনন্দময় বলেই খেলাকে সবাই উপভোগ করে। যে খেলায় আনন্দ নেই, সে খেলার পিছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করে। খেলার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন সেরকমই একটি উদ্দেশ্য। আর অর্থের উদ্দেশ্যে যে খেলা হয় সে খেলাকে জুয়াখেলা হিসেবে চিহ্নিত। লেখক তাই আনন্দবিহীন খেলাকে জুয়াখেলা বলেছেন।
প্রশ্ন-১৯. 'তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: উক্তিটির মাধ্যমে যারা পাঠকের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করেন তাদের সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে, তারা সাহিত্যের মর্ম বুঝতে অক্ষম।
সাহিত্য রচিত হয় লেখকের মনের আনন্দের জন্য এবং অন্যকে আনন্দ দেওয়ার জন্য। এর বাইরে অন্য কোনো ফললাভের আশা লেখকদের করা উচিত নয় বলে প্রমথ চৌধুরী মনে করেন। যারা আনন্দ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন তারা যে সাহিত্যের মর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ, সে বিষয়টি উদ্ধৃত উক্তির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন-২০. 'খেলা হচ্ছে জীবজগতে একমাত্র নিষ্কাম কর্ম।'- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: খেলা হলো জীবজগতে একমাত্র নিষ্কাম কর্ম, কারণ- এতে কোনো কিছু লাভের বা পাওয়ার অভিপ্রায় থাকে না।
লেখকের মতে, মানুষ খেলায় আনন্দ ব্যতীত অন্য কোনো ফলের আকাঙ্ক্ষা করে না। যদি তা করে তবে তা হয় জুয়াখেলা। প্রাবন্ধিক এরূপ নিষ্কাম খেলার সাথে সাহিত্যের সাদৃশ্য উপস্থাপন করেছেন। খেলার মতো সাহিত্যের উদ্দেশ্যও আনন্দ লাভ করা। অর্থাৎ খেলা বা সাহিত্য দুইটিই জীবজগতে হতে হবে কোনো কামনা ছাড়া কাজ। যে কাজের উদ্দেশ্য হবে শুধু আনন্দের প্রাপ্তি।
প্রশ্ন-২১. 'কবির সৃষ্টিও এই বিশ্বসৃষ্টির অনুরূপ।'- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বিশ্ব সৃষ্টিতে ঈশ্বরের যেমন কার্যোদ্ধারের উদ্দেশ্য নেই সাহিত্য সৃষ্টিও তেমনই অভিপ্রায়হীন।
বিশ্ববিধাতার কোনোকিছুরই অভাব নেই। তারপরও তিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন শুধু নিজের আনন্দের জন্য। কবির রচনার ক্ষেত্রেও একইরকম স্ফূর্তি ও উদ্দীপনা থাকলে তবেই সেই রচনা সার্থক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কবির কাজ কারো মনোরঞ্জন করা নয় বা অভাব দূর করা নয় বরং নিজে আনন্দ পাওয়া ও সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষকে এক আনন্দময় জগতের সন্ধান দেওয়া।
প্রশ্ন-২২. কবির সৃষ্টিকে বিশ্বসৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কেন?
উত্তর: ঈশ্বর কর্তৃক বিশ্বসৃষ্টির মতোই কবির সৃষ্টিও অভাব দূর করার অভিপ্রায়যুক্ত, তাই এমন তুলনা করা হয়েছে।
কোনো অভাববোধ থেকে নয় বরং লীলা প্রকাশের উদ্দেশ্যেই ঈশ্বর এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। কবির কাব্য সৃষ্টিও ঈশ্বরের বিশ্বজগৎ সৃষ্টির সঙ্গে তুলনীয়। কারণ, কবি কাব্যকলার চর্চা করেন কোনো অভাববোধ কিংবা দায়বোধ থেকে নয়। অন্তরাত্মার স্ফূর্তি ও তার ফল লাভের অভিপ্রায়েই কবির সৃষ্টিকর্ম এগিয়ে চলে। সৃজনের আনন্দই কবির একমাত্র প্রাপ্তি। তাই কবির কাব্য সৃষ্টি ঈশ্বরের বিশ্বসৃষ্টির মতোই আনন্দমুখী, অভাব দূর করার অভিপ্রায়মুক্তি এবং সাদৃশ্যপূর্ণ।
প্রশ্ন-২৩. 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দদান করা, কারো মনোরঞ্জন করা নয়।'- কেন?
উত্তর: মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে।
বস্তুত সাহিত্যের প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া, খেলায় মানুষ যেরূপে আনন্দ পেয়ে থাকে। মনোরঞ্জন করার মধ্যে কোনো একটা কৃত্রিম প্রয়াস বা বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু আনন্দ দেওয়ার ব্যাপারটিতে কোনো উদ্দেশ্য বা স্বার্থচিন্তা থাকে না, তা স্বতঃস্ফূর্ত। সাহিত্য যদি কারো মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্যে রচিত হয়, তবে তা হয়ে পড়ে স্বধর্মচ্যুত। পক্ষান্তরে আনন্দের সন্ধান মেলে স্বতঃস্ফূর্ত খেলার ভিতর দিয়ে। তাই সাহিত্যের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে অনুরূপ উক্তি করা হয়েছে।
প্রশ্ন-২৪. 'কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা।'-কারণ কী?
উত্তর: সাহিত্য হলো মানবজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদি আবেগ ও অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশ, যা থেকে আনন্দ নামক অভিন্ন রসের খোরাক মেটে।
সাহিত্যে অনেক সময় মানবজীবনের ট্র্যাজিক বেদনার রূপ প্রতিফলিত হয়। তা আস্বাদনে সবাই একধরনের আনন্দলাভ করে। যদিও তার মূলে রয়েছে বেদনাময় আখ্যান। পাঠক সমাজকে আনন্দ দিতে গেলে কবিরা অনেক সময় বেদনা বোধ করে থাকেন। তাই কাব্যজগতে যা আনন্দ রসের আধার, তার অন্য নাম বেদনা।
প্রশ্ন-২৫. কীভাবে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়?
উত্তর: সমাজের মনোরঞ্জন করা সাহিত্যের কাজ নয় আর তা করতে গেলেই সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে।
সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া। সাহিত্যরাজ্যে মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলা করার মতো সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সাহিত্যরাজ্যে খেলনা সৃষ্টি করা হলে তা ক্ষণস্থায়ীভাবে পাঠকের মনতুষ্টি করতে পারবে কিন্তু তা পুরোনো হলেই সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাবে। অন্যদিকে, যে সাহিত্য থেকে মানুষ আনন্দ আহরণে সক্ষম হয় সেই সাহিত্যই হয় কালজয়ী। অর্থাৎ মানুষের মনোরঞ্জন করার উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করা হলেই সাহিত্য তার স্বধর্ম হারায়।
প্রশ্ন-২৬. 'অতি সস্তা খেলনা' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে 'অতি সস্তা খেলনা' বলতে সেই সাহিত্যকে বোঝানো হয়েছে, যা অতি সহজেই পাঠকের মনোরঞ্জন করে।
লেখকের মতে, সাহিত্যের প্রধান উদ্দেশ্য আনন্দ দেওয়া, কারো মনোরঞ্জন করা নয়। সাহিত্য যখন কারো মনোরঞ্জন করে তখন তার মধ্যে আর কোনো আদর্শ থাকে না। তা পরিণত হয় একটি সস্তা খেলনায়। প্রকৃত সাহিত্যিকদের কাছ থেকে এরকম 'সস্তা খেলনা' জাতীয় সৃষ্টিকর্ম প্রাবন্ধিক প্রত্যাশা করেন না।
প্রশ্ন-২৭. সাহিত্যে পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করতে কেন নিষেধ করা হয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত ও মানহীন হতে পারে বলে সাহিত্যে পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করতে নিষেধ করা হয়েছে।
সাহিত্য কারো মনোরঞ্জনের লক্ষ্যে সৃষ্টি হয় না। সকলকে আনন্দদান করাই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। তাছাড়া এ যুগের পাঠক সমাজ হলো সর্ব-স্তরের জনসাধারণ। গড়পরতা তাদের পাঠাভ্যাসের মানও খুব উঁচু নয়। ফলে বর্তমানের এই পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সস্তা মানের সাহিত্য নির্মাণ আবশ্যক হয়ে পড়বে। তাই সাহিত্যে আর যাই হোক, এ যুগের পাঠক সমাজের মনোরঞ্জন করতে নিষেধ করা হয়েছে।
প্রশ্ন-২৮. সাহিত্যের মাধ্যমেকারো মনোরঞ্জন করা উচিত নয় কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মনোরঞ্জন করা যদি সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, তাই সাহিত্যের মাধ্যমে কারো মনোরঞ্জন করা উচিত নয়।
প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যকে মনোরঞ্জন বা শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণের বিপক্ষে। সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দদান করা। মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে যায়। লেখক তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য কৃতিত্ব, প্রশংসা ও বাহবা দাবি করতে পারেন কিন্তু হাততালি ও বাহবা পাওয়া যদি সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য হয় তাহলে সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
প্রশ্ন-২৯. 'কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত।'-কেন?
উত্তর: 'কবি ও শিক্ষকের মতিগতি সম্পূর্ণ বিপরীত।'- উক্তিটির মাধ্যমে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্য ও শিক্ষার উদ্দেশ্যের ভিন্নতার কথাই বলতে চেয়েছেন।
প্রাবন্ধিকের মতে, শিক্ষা বিষয়টি মানুষ সাধারণত নিতান্তই অনিচ্ছার সাথে গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয়। আর এই করার কাজটির দায়িত্বে - থাকেন শিক্ষক। অন্যদিকে, কবির উদ্দেশ্য সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের মনের জাগরণ ঘটানো। এটি বল প্রয়োগে নয় বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলেই কেবল সম্ভব। এ কারণেই শিক্ষক ও কবির মতিগতি সম্পূর্ণ বিপরীত বলা হয়েছে।
প্রশ্ন-৩০. শিক্ষার উদ্দেশ্যও সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখকের অভিমত ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দদান করা এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষকে জ্ঞানদান করা।
শিক্ষা মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয়। পক্ষান্তরে সাহিত্যের রসাস্বাদন করে মানুষ স্বেচ্ছায় ও আনন্দে। তা মানুষের মনের দরজা খুলে দেয়। সাহিত্য ও শিক্ষার উদ্দেশ্যের পার্থক্য এখানেই। লেখকের মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য আনন্দদান করা, শিক্ষাদান করা নয়। উভয়ের উদ্দেশ্য এক নয়।
প্রশ্ন-৩১. সাহিত্য রচনাকে খেলা করার সাথে তুলনা করা হয়েছে কেন?
উত্তর: সাহিত্যের কাজ হলো মানুষকে আনন্দ দেওয়া আর পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল আনন্দের উপায় হলো খেলা করা।
'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের লেখক প্রমথ চৌধুরী মত প্রকাশ করেছেন-মানুষের দেহমনের সকল ক্রিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো ক্রীড়া বা খেলা। কেননা, তাতে কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। নিছক আনন্দের জন্যই মানুষ খেলা করে। সাহিত্যের উদ্দেশ্যও একইভাবে মানুষকে নিবিড় আনন্দ প্রদান করা। সেইসাথে খেলার ময়দানে যেমন ধনী-গরিব বা ছোটো-বড়ো কোনো ভেদাভেদ নেই তেমনই সাহিত্যের অঙ্গনেও কারো প্রবেশাধিকারে বাধা নেই। লেখক তাই সাহিত্য রচনাকে খেলা করার সাথে তুলনা করেছেন।
প্রশ্ন-৩২. শাস্ত্রমতে সাহিত্যেররস অমৃত কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অমৃত পান করে এবং মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করার জন্য সাহিত্যের রস উপলব্ধি করে।
সাহিত্য মানুষকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখে। লেখক কাব্যরস অনুধাবন করে কাব্য রচনা করলে তা লেখকের মৃত্যুর পরও রয়ে যায়, যা একজন লেখককে সারা জীবন পাঠকের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে। মানুষ সারা জীবন বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অমৃত পান করে। মানুষ যদি সাহিত্যের রস উপলব্ধি করতে পারে তবে এর মাধ্যমে মানুষ হাজার বছর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। সাহিত্যের মৃত্যু নেই। সাহিত্য আজীবন পাঠকের মনে রসের সঞ্চার করে। সেই রস উপলব্ধি করে মানুষ নিজের মধ্যে সেই লেখককে বাঁচিয়ে রাখে। তাই সাহিত্যের রস অমৃত।
প্রশ্ন-৩৩. 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো।'- প্রাবন্ধিক কথাটি কেন বলেছেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যক্ত করার জন্যই প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষকে শিক্ষা দেওয়া নয়। সাহিত্যের রস অমৃত সুধার মতো সঞ্জীবনী শক্তিসম্পন্ন। এর স্পর্শে মানুষের অন্তরাত্মা সজীব ও বিকশিত হয়। মানুষের মাঝে সত্যিকার অর্থে মানবিকতার জাগরণ ঘটায় সাহিত্য। শিক্ষাদানের মতো জোরপূর্বক প্রক্রিয়ায় নয় বরং আনন্দদানের মাধ্যমে মনকে জাগানোই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন-৩৪. 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে কাব্য এবং সংবাদপত্রের অবস্থান বিপরীতধর্মী কেন?
উত্তর: কাব্য সৃষ্টির মূলে রয়েছে অন্তরাত্মার স্ফূর্তি, অন্যদিকে সংবাদপত্রের কাজ সংবাদ সরবরাহ। ফলে 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে এ দুটির অবস্থান বিপরীতধর্মী।
কবিমনের অনুভূতি থেকে কাব্যের উৎপত্তি। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা জ্ঞান বিতরণ করা নয় বরং কবি তাঁর আপন প্রাণের আনন্দকে সবার করে তোলার জন্যই কাব্যকলা নির্মাণ করেন। অপরদিকে, সংবাদপত্রের কাজ নির্দিষ্ট, আর তা হলো প্রতিদিনের সংবাদ ও সংবাদযোগ্য তথ্য সকলের সামনে উপস্থাপন করা। কাব্যের সঙ্গে কোনোভাবেই সংবাদপত্রের উদ্দেশ্যকে মেলানো যায় না। তাই 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে কাব্য এবং সংবাদপত্রের অবস্থান পরস্পরের বিপরীত মেরুতে।
প্রশ্ন-৩৫. 'সাহিত্যের উদ্দেশ্য শিক্ষাদান করা নয়'- বলতে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: সাহিত্যের উদ্দেশ্য আনন্দদান করা, শিক্ষাদান করা নয়।
সাহিত্য মানুষের মনোজগৎকে জাগ্রত করে। সাহিত্য মানবজীবনে সুখ, দুঃখ, আবেগ, অনুভূতি ইত্যাদি শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করতে শেখায়। সাহিত্য মানুষকে উপলব্ধির জগৎ তৈরি করে দেয়। সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলতে পারে। সাহিত্যের রস উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ মনোজগতে বিচরণ করতে পারে। সাহিত্য জগতে কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক ধরাবাধা নিয়ম রয়েছে। মানুষের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার বিষয়টি অনুধাবন করতে হয় বা মুখস্থ করতে হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য মনকে বিশ্বের খবর জানিয়ে দেওয়া আর সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া।
প্রশ্ন-৩৬. বাল্মীকির রামায়ণও যোগবশিষ্ঠ রামায়ণের মৌলিক বিরোধ কোথায়?
উত্তর: বাল্মীকির রামায়ণ ও যোগবশিষ্ঠ রামায়ণের মৌলিক বিরোধ হলো- একটি রচিত হয়েছিল আনন্দদানের জন্য এবং অপরটি শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে।
বাল্মীকি রচিত রামায়ণ শ্রবণে ও পাঠে সন্ধান মেলে আনন্দের। আর আনন্দ সংক্রামক হওয়ায় তাঁর রামায়ণ আজও নিয়মিত চর্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে, যোগবশিষ্ঠ রচিত রামায়ণ আবেদনময় হয়ে উঠতে পারেনি কেননা, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাদান করা। তাই মানুষ সেই রামায়ণের ছায়াও মাড়ায় না। এই মৌলিক বিরোধটির ফলেই দুই রচয়িতার রামায়ণের দুই ধরনের পরিণতি হয়েছে।
প্রশ্ন-৩৭. 'আনন্দের ধর্মই এই যে তা সংক্রামক।'- বলতে কোন প্রসঙ্গে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিতে বোঝানো হয়েছে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষকে আনন্দ দেওয়া আর তা সহজেই সবার হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়।
বাল্মীকি রচিত রামায়ণ মুনিঋষিদের জন্য রচিত হলেও এর সাহিত্যগুণের কারণে তা সমাদর পেয়েছে সবকালে। আনন্দ প্রদানের ক্ষমতা থাকায় আজও সেই রামায়ণের চর্চা রয়েছে। কেননা, সেই আনন্দ ক্রমে সংক্রমিত হয়েছে মানুষের মাঝে। অন্যদিকে, শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রচিত যোগবশিষ্ঠ রামায়ণের সেই গুণটি ছিল না। ফলে তা আবেদনময় হয়ে ওঠেনি।
প্রশ্ন-৩৮. কাব্যরস নামক অমৃতে আমাদের অরুচি জন্মেছে কেন?
উত্তর: বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাদান পদ্ধতির ত্রুটির কারণে কাব্যরস নামক অমৃতে আমাদের অরুচি জন্মেছে।
'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরী শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রভেদ স্পষ্ট করেছেন। শিক্ষা মানুষ গ্রহণ করে নিরানন্দভাবে ও অনেকটা বাধ্য হয়ে। অপরদিকে, সাহিত্যরস মানুষ গ্রহণ করে স্বেচ্ছায়। প্রাবন্ধিকের মতে, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক কর্তৃক কাব্য পাঠদানের ফলে কাব্যসাহিত্য আনন্দের উৎস না হয়ে ভীতির বিষয় হয়ে পড়েছে। তাছাড়া কবি ও পাঠকের মাঝখানে শিক্ষক দেওয়ালরূপে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় কাব্যরস নামক অমৃতে আমাদের অরুচি জন্মেছে।
প্রশ্ন-৩৯. 'লেখক ও পাঠকদের মধ্যে এখন স্কুলমাস্টার দণ্ডায়মান।'-উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: স্কুলমাস্টারদের শিক্ষাপদ্ধতির কারণে পাঠক সাহিত্যের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সাহিত্য ও শিক্ষার প্রকৃতি একরূপ নয়। সাহিত্য জোর করে বোঝার বিষয় নয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করতে না পারলে এর আসল স্বাদ পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের স্কুলমাস্টারগণের গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীরা কবির মনের ভাব বুঝতে সক্ষম হচ্ছে না। এ কারণেই বলা হয়েছে, কবি ও পাঠকদের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্কুলমাস্টার।
প্রশ্ন-৪০. স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই না কেন?
উত্তর: স্কুলমাস্টারেরা বর্তমানে সাহিত্যচর্চা শেখানোর দায়িত্ব নেওয়ায় সাহিত্যের আসল রস থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।
সাহিত্য প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মতো শেখার বিষয় নয়। তীব্র জ্ঞানপিপাসা ও এই রাজ্যে খেলা করার আকাঙ্ক্ষা থাকলে যে কেউ এ রাজ্যে স্বচ্ছন্দভাবে বিচরণ করতে পারে। কিন্তু স্কুলমাস্টাররা সাহিত্য শিক্ষাদানের ভার নেওয়ায় সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁরা কাব্যের শবচ্ছেদ করে তার নিগূঢ় তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু তাতে আমরা কাব্যের আসল স্বাদ ও আনন্দ পাচ্ছি না। তাই স্কুলঘরের শিক্ষার্থীরা কাব্যের রূপ দেখতে পাচ্ছে না বরং দেখছে শুধু কাব্যের বিশ্লেষিত শবদেহ।
প্রশ্ন-৪১. সাহিত্য শিক্ষার ভার নেয় না কেন?
উত্তর: জ্ঞানের কথা বলা নয়, বরং সাহিত্যের উদ্দেশ্য আনন্দদান হওয়ায় তা শিক্ষার ভার নেয় না।
শিক্ষা হলো সেই বস্তু যা লোকে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গলাঃধকরণে বাধ্য হয়। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষের মনকে বিশ্বের খবর দেওয়া, মনকে জাগানো নয়। কিন্তু সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে স্বচ্ছন্দে আনন্দের খোঁজ দেওয়া। সাহিত্যের রাজ্যে শিক্ষা রাজ্যের মতো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সেখানে মানুষ মনের আনন্দে খেলা করতে পারে। শিক্ষার ভার নেওয়া তাই সাহিত্যের কাজ নয়। শিক্ষাদান করা শিক্ষকেরই সাজে, কবির নয়।
প্রশ্ন-৪২. মনোজগতে শিক্ষকের কাজ লেখকের কাজের বিপরীত কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শিক্ষকের কাজ শিক্ষাদান করা আর লেখকের কাজ আনন্দ দেওয়া।
মনোজগতে শিক্ষা স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে না। মানুষ বাধ্য হয়ে শিক্ষার বিষয়গুলোকে মুখস্থ করে। এই মুখস্থ শিক্ষা বেশিদিন মানবমনে জায়গা করে নিতে পারে না। তাই মনোজগতে শিক্ষকও বেশিদিন থাকতে পারেন না। পক্ষান্তরে লেখকের কাব্যরস পাঠক অনুধাবন করতে পারলে লেখক আজীবন মানবমনে রয়ে যায়। লেখকের কাজ হলো মানুষের মনোজগতে সাহিত্যের রস উপলব্ধি করতে শেখানো। আর শিক্ষকের কাজ মানুষকে বিশ্বের খবর জানিয়ে দেওয়া। তাই বলা যায়, মনোজগতে শিক্ষকের কাজ লেখকের কাজের বিপরীত।
প্রশ্ন-৪৩. 'সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়'- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: তীব্র জ্ঞানপিপাসা না থাকলে চাইলেই সাহিত্যকে আত্মস্থ করা যায় না তেমনই প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে সাহিত্যের স্বাদ পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।
সাহিত্য মানুষকে আত্মিক প্রশান্তি দান করে। সাহিত্যের ভিতর থেকে এর প্রকৃত আনন্দরস নিংড়ে নিতে হলে চাই সাহিত্যের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আত্মনিবেদন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ করা হয় ও সাহিত্যের গূঢ় অর্থ বোঝানো হয়। কিন্তু পাঠকের জ্ঞান আহরণের তীব্র ইচ্ছা ছাড়া কোনো উপায়েই এর অমৃত সুধা পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাই বলা হয়েছে, 'সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, কিংবা গুরুর হাতের বেতও নয়।'
প্রশ্ন-৪৪. সাহিত্য জগতে লেখকের প্রকৃত কাজ কী?
উত্তর: মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্য নয় বরং মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য সাহিত্য রচনা করাই লেখকের কাজ।
মানুষের মনোরঞ্জন করার জন্য রচিত সাহিত্যকে খেলনার সাথে তুলনা করেছেন 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধের লেখক প্রমথ চৌধুরী। খেলনাসদৃশ এই রচনা মানুষকে সাময়িক তুষ্টি প্রদান করলেও দুদিন পর এটি খেলনা হয়ে যায়। লেখকের কাজ তাই খেলনা তৈরি করা নয় বরং নিজের মনের আনন্দে সাহিত্য জগতে খেলা করা ও মানুষের মনের কাছাকাছি পৌছানোর সাধনা করা।
প্রশ্ন-৪৫. লেখকের মতে, সাহিত্যে কোন আত্মা খেলা করে? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: লেখকের মতে, সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে।
সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে এবং সেই খেলার আনন্দ উপভোগ করে। সাহিত্য সৃষ্টি হয় মানবাত্মাকে জাগ্রত করার জন্য। সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানবাত্মাকে আনন্দ দেওয়া। সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো মানুষ। মানুষের জীবনের নানা দিক নিয়ে সাহিত্যের সৃষ্টি। মানবজীবনের প্রেম-বেদনা, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ ইত্যাদি নিয়ে সাহিত্যের সৃষ্টি। সাহিত্য মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে বিচরণ করে মানবমনে অনুভবের জগৎ তৈরি করে। মানবাত্মাকে বিভিন্ন রূপে সাহিত্য উপস্থাপন করতে পারে। তাই সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে এবং সেখানে আনন্দের জগৎ তৈরি করে।
